আজ পিলখানা হত্যা দিবস: সে দিন যা ঘটেছিল

by sylhetmedia.com

সিলেট মিডিয়া ডেস্ক : ২৫শে ফেব্রুয়ারী, বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কলঙ্কিত অধ্যায়। ২০০৯ সালের এই দিনে বাংলাদেশ রাইফেলসের সদর দপ্তর পিলখানায় কিছু বিপথগামী জোয়ান বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং এক নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালায়। এর জেরে দেশের বিভিন্ন স্থানের কয়েকটি ব্যাটালিয়নেও বিদ্রোহ দেখা দেয়। পিলখানাতে প্রাণ হারান ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ বিডিআরের ঊর্ধ্বতন ৭৪ কর্মকর্তা।

সরকারিভাবে এ দিনটিকে পালন করা হয় ‘পিলখানা হত্যা দিবস’। সেই দিন পিলখানায় যে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ঘটেছিল তা শিউরে ওঠার মতো। সে দিনের সেই  নৃশংসতা ও নিষ্ঠুরতা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও ছাড়িয়ে গেছে। সেদিন হত্যার পাশাপাশি লাঞ্ছনার শিকার হয়েছে অনেক নারী।

আওয়ামী লীগ সরকারের গত মেয়াদে দায়িত্ব নেয়ার মাত্র দুই মাসের মাথায় একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর অভ্যন্তরে এমন ঘটনা ঘটে। অপারেশন ডাল-ভাত কর্মসূচির দুর্নীতি রোধ, বিডিআর সদস্যদের জাতিসংঘ মিশনে অন্তর্ভুক্তি, রেশন বৃদ্ধি, বিডিআরের নিজস্ব কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বাহিনী পরিচালনাসহ বেশ কয়েকটি দাবি তোলে বিডিআরের কিছু সদস্যরা। সে দাবি পুরণ না হওয়ায় অসন্তোষ সৃষ্টি হয় বাহিনীর সাধারণ জওয়ানদের মধ্যে। এ অসন্তোষই বিদ্রোহের প্রধান কারণ বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক।

পিলখানা ট্র্যাজেডির দুই বছর পর এ বাহিনীটির নাম পরিবর্তন করে তাকে ঢেলে সাজানো হয়েছে। নাম পরিবর্তন করে তা রাখা হয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। নাম পরিবর্তণের পাশাপাশি পরিবর্তন করা হয়েছে এ বাহিনীটির আইন, পোশাক, লোগো ও পতাকাসহ প্রায় সব কিছু।  ২৫ ফেব্রুয়ারি ফিরে এলেই গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় স্মরণ করা হয় সে দিনের নিহত সে সব শহীদদের।

সে দিন যা ঘটেছিল :  ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৯। বিডিআরের তিন দিনব্যাপী রাইফেলস সপ্তাহের প্রথম দিন। বর্ণাঢ্য আয়োজনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর উদ্বোধন করেন। পর দিন ২৫ ফেব্রুয়ারি বুধবার। তৃতীয় দিন ২৬ ফেব্রুয়ারি নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন আর উৎসবের মধ্যদিয়ে শেষ হওয়ার কথা ছিল বিডিআরের এই আয়োজনটি। কিন্তু তার আগেই ঘটে গেলো ইতিহাসের এক করুণ কাহিনী।

সেদিন সকাল ৯টায় তৎকালীন বিডিআর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমদের পরিচালনায় পিলখানার দরবার হলে বসেছিল বার্ষিক দরবার। সেখানে সারাদেশ থেকে আসা বিডিআরের জওয়ান, জেসিও, এনসিওসহ বিপুল সদস্যের উপস্থিতিতে পরিপূর্ণ গোটা দরবার। এসময় একদল বিপথগামী বিডিআর জওয়ান দরবার হলে ঢুকে মহাপরিচালকের সামনে তাদের নানা দাবি উত্থাপন করেন। সিপাহী মঈন নামে এক জওয়ান ডিজির সামনে তাক করেন বন্দুকের নল। তিনি গুলি চালাতে না পারলেও অপর জওয়ানরা এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে শুরু করে। একপর্যায়ে ব্যারাক থেকে শত শত বিডিআর সদস্য বেরিয়ে দরবার হল আক্রমণ করে। শুরু হয় বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ। পুরো অস্ত্রাগার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় বিদ্রোহীরা।

বিদ্রোহ সামাল দিতে সরকারের ভূমিকা :  বিদ্রোহ শুরুর পরপরই প্রধানমন্ত্রী তার বাসভবনে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ ও বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যদের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেন। বিদ্রোহ দমনে বিদ্রোহীদের সঙ্গে নানা ভাবে কাজ বৈঠক করেন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল, শেখ ফজলুল করিম সেলিম ও কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীসহ ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতারা। সে দিন জীবনের ঝুঁকি নিয়েও তারা ছুটে গেছেন পিলখানায় এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে পর্যাপ্ত ভূমিকা রেখেছেন। সরকারের বলিষ্ঠ এ পদক্ষেপের পর বিদ্রোহী জওয়ানরা আত্মসমর্পণ শুরু করেন। অবসান হয় ৩৬ ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধ কর পরিস্থিতির।

নির্মম হত্যাযজ্ঞ : এক দিকে বিদ্রোহ থামাতে সরকার একের পর এক বৈঠক করে যাচ্ছে আর এর মধ্যে বিদ্রোহীরা চালিয়ে যায় নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ। তৎকালীন ডিজি মেজর জেনারেল শাকিল আহমদকে দরবার হল থেকে টেনে সামনের রাস্তায় নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। প্রায় একই সময় হত্যা করা হয় ৬ সেনা কর্মকর্তাকে। জওয়ানরা অস্ত্রাগার ভেঙে দফতরের ভেতরে কর্মকর্তাদের বাসায় বাসায় ঢুকে হামলা ও লুটপাটসহ পৈশাচিক নির্যাতন শুরু করে তাদের পরিবারের ওপর। ডিজির বাসায় ঢুকে তার স্ত্রী নাজনীন শাকিল ও গৃহপরিচারিকাকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে। সেদিন তার বাসায় বেড়াতে আসা স্বজনরাও রক্ষা পায়নি ঘাতকদের হাত থেকে।

লাশ নিয়ে বর্বরতা :  ২৫ ফেব্রুয়ারি সারাদিন ও রাতে পিলখানায় যে হত্যাযজ্ঞ আর লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে তা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। নির্বিচারে সেনা কর্মকর্তাদের হত্যার পর লাশ নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে খোদ ঘাতকরা। পরে পিলখানায় খোড়া হয় গণকবর। সেখানেই রাখা হয় বিডিআরের ৪২টি লাশ। বাকিগুলোকে ফেলে দেয়া হয় ম্যানহোলে। পরদিন সেগুলো বুড়িগঙ্গা থেকে উদ্ধার করা হয়। অনেক লাশ আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়।

বিচার প্রক্রিয়া :  বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় পিলখানাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিডিআর আইনে মোট ৫৭টি মামলা হয়। এসব মামলায় মোট আসামি করা হয় ৬ হাজার ৪১ জনকে। এজন্য সারাদেশে স্থাপন করা হয় ১১টি বিশেষ আদালত।সবকটি মামলায় সাক্ষগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের পর মোট ৫ হাজার ৯২৬ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়েছে। খালাস পেয়েছেন ১১৫ জন জওয়ান।  বিচার চলাকালে নানা কারণে মারা যাওয়ায় অব্যাহতি পেয়েছেন পাঁচ জন।

তবে বিচার চলাকলে এর স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তা বন্ধ করার দাবি জানিয়েছিলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ (এইচআরডব্লিউ) বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা। মামলা চলাকালে রিমান্ডে নেয়ার পরে অনেক জওয়ানের মৃত্যু নিয়ে বেশ বিতর্কের সৃষ্টি হয়। যদিও বেশিরভাগ মৃত্যুর ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাকের কথা বলে কর্তৃপক্ষ।

মামলাগুলোর মধ্যে ২০০৯ সালে ২৪ অক্টোবর প্রথম বিচার শুরু হয় রাঙামাটির ১২ রাইফেলস ব্যাটালিয়ন রাজনগরের ৯ জওয়ানের বিরুদ্ধে। পরে ২০১০ সালের ২ মে এই মামলার প্রত্যেক আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়। বিদ্রোহ মামলার প্রথম রায় হয় পঞ্চগড়ের ২৫ রাইফেলস ব্যাটালিয়নের।মামলার সর্বশেষ রায়টি দেয়া হয় ২০১২ সালের ২০ অক্টোবর।

Related Posts



cheap mlb jerseyscheap nfl jerseyscheap mlb jerseyscheap nhl jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseys