যেখানে ফারাওরা থাকেন

by sylhetmedia.com

এসবিএন ডেস্ক:
সেই ছোটবেলায় পাঠ্যপুস্তক থেকে মিসরের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে অল্পবিস্তর পরিচিত হয়েছিলাম। বলা যায় তখন থেকেই নিজের ভেতরে মিসরের পিরামিড ও নীল নদ দেখার একটা সুপ্ত ইচ্ছা তৈরি হয়েছিল।

ঢাকা থেকে কুয়েত সিটি পৌঁছতে সময় লেগে গেল সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার মতো। মাঝখানে তিন ঘণ্টা ১৫ মিনিটের বিরতি। এরপর আবার উড়াল দিলাম। প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর কায়রো ইন্টারন্যাশনাল বিমানবন্দরে এসে নামল বিমানটি।

আগেই রুম বুকিং ছিল গ্র্যান্ড পিরামিড হোটেলে। হোটেলটা কায়রো এয়ারপোর্ট থেকে ২৬ কিলোমিটার দূরে। তবে গিজা পিরামিডের খুবই কাছে। আর ভাড়া সে হিসেবে তেমন একটা নয়, বাংলাদেশি ২৮০০ টাকা।

কপাল ভালোই বলতে হবে। আমাদের রুম পড়েছে হোটেলের তিন তলায়। সেখান থেকে পিরামিডের উঁচু অংশটা দিব্যি দেখা যায়। হোটেলে পৌঁছতে রাত বেশি হয়ে যাওয়ায় সেদিন আর পিরামিড দেখা হলো না।

পরদিন সকাল ৮টায় ঘুম থেকে উঠে কোনো রকম চোখে-মুখে পানি দিয়েই হোটেল থেকে বের হয়ে গেলাম। নাশতাও করলাম না। পিরামিড দেখার জন্য এমনই আকুলিবিকুলি করছিল মনটা। আগের দিন রাতেই হোটেল ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে রেখেছিলাম। তাঁর কাছ থেকে পিরামিড ভ্রমণসংক্রান্ত বেশ কিছু টিপসও পেলাম। তিনিই জানালেন এই হোটেলের খুব কাছ থেকেই কিছু মাইক্রোবাস চলাচল করে, যা সরাসরি পিরামিডের কাছে পৌঁছে দেয়। দুই বন্ধু একটা মাইক্রোবাসে চেপে বসলাম। ভাড়া জনপ্রতি দুই মিসরীয় পাউন্ড, বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২০ টাকা। ট্যাক্সিতে গেলে ভাড়া নাকি বেশি পড়বে, ১৫ থেকে ২০ মিসরীয় পাউন্ড। মাইক্রোবাসে করে পিরামিডে পৌঁছতে সময় লাগল ৭-৮ মিনিট। পিরামিডের কম্পাউন্ডে ঢোকার আগে এক মিসরীয় রেস্টুরেন্টে গেলাম সকালের নাশতা করার জন্য। তাতে ছিল ওদের ঐতিহ্যবাহী খাবার কাশহারি ও ফিলাফিল। দুটির স্বাদ দুই রকম। কিন্তু ফিলাফিলটা ছিল একটু বেশি মজার। ওটা খেতে হয় রুটি আর বিশেষ একধরনের সস ও সালাদ দিয়ে।

নাশতা খেয়ে বের হতেই কয়েকজন মিসরীয় যুবক এগিয়ে এসে নিজেদের স্থানীয় ট্যুরিস্ট গাইড হিসেবে পরিচয় দিল। জানালো, ঘোড়ার গাড়িতে করে ঘুরে ঘুরে পিরামিড দেখতে চাইলে আমাদের দুজনের জন্য লাগবে ৬০০ মিসরীয় পাউন্ড আর উটে চড়তে জনপ্রতি ৭০০ মিসরীয় পাউন্ড। দরদাম করে শেষ পর্যন্ত একটা ঘোড়ার গাড়িই ঠিক করলাম ২৮০ মিসরীয় পাউন্ড দিয়ে। এই টাকায় প্রায় তিন ঘণ্টা ঘুরিয়ে দেখাবে পুরো পিরামিডের এলাকা।

এক্কা গাড়ির মতো দেখতে ওদের ঘোড়ার গাড়িগুলো। লাল রঙের। তবে হুডটা সাদা। রোদের উত্তাপ যেন কম লাগে সে জন্যই বোধ হয়।

পিরামিড কম্পাউন্ডের ভেতরে ঢোকার পর মনে হলো, ওই দেখা যায় পিরামিড! কতই না কাছে ওটা। দুই পা হাটলেই পৌছে যাবো। কিন্তু ঘোড়ার গাড়ি যতই সামনের দিকে যাচ্ছে, ততই মনে হচ্ছে রাস্তা যেন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। শেষই হচ্ছে না। পরে জানতে পারলাম পিরামিড থেকে প্রবেশ গেট প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে।

প্রত্যেক বিদেশি পর্যটকের জন্য পিরামিডের প্রবেশ মূল্য ৮০ মিসরীয় পাউন্ড। শুধু তা-ই নয়, পিরামিডের ভেতরের জাদুঘর দেখতে হলে বাড়তি দিতে হবে আরো ২০০ মিসরীয় পাউন্ড। তখন বেলা প্রায় ১১টা। আমাদের গাইড মুহাম্মদ ইব্রাহিম দুটি টিকিট নিয়ে এলো। পিরামিডের কাছে যেতেই থমকে গেলাম, আর কিছুক্ষণ অবাক নয়নে তাকিয়ে রইলাম। সত্যিই এই আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও প্রাচীন শ্রমিকদের অতি কষ্টের তৈরি এই পিরামিড আসলেই অসাধারণ আর আশ্চর্যের এক স্থাপনা।

প্রাচীন মিসরীয় শাসকদের কবর বা সমাধি দেওয়ার জন্য তৈরি করা হতো এসব পিরামিড। মিসরে ছোট-বড় মিলিয়ে রয়েছে ৭৫টি পিরামিড। সবচেয়ে বড় ও আকর্ষণীয় পিরামিড হচ্ছে গিজার পিরামিড। এটি ‘খুফুর’ পিরামিড হিসেবে পরিচিত। তৈরি হয়েছিল প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে। ৪৮১ ফুট উচ্চতা ও ৭৫৫ বর্গফুটের এই পিরামিডটি তৈরি করতে সময় লেগেছিল প্রায় ২০ বছর। খেটেছিল আনুমানিক এক লাখ শ্রমিক। আমাদের গাইড জানাল, প্রতিবছর লাখ লাখ পর্যটক আসে এই পিরামিড দেখার জন্য। তবে বর্তমানে পর্যটক কমে গেছে দেশের রাজনৈতিক উত্তেজনার কারনে। আইএসএর হামলার হুমকি তো আছেই।

পিরামিডের পাশেই আরো রয়েছে বিশ্ববিখ্যাত এক মূর্তি। মানুষ এটিকে চেনে, ‘দ্য গ্রেট স্ফিংস অব গিজা’ নামে। ৩০০০ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দে তৈরি করা এই প্রাচীন স্থাপত্যটি পৃথিবীর সর্ববৃহত্ মনোলিথ মূর্তি, যার দৈর্ঘ্য ৭৩.৫ মিটার, প্রস্থ ৬ মিটার আর উচ্চতা ২০ মিটার। স্ফিংসের মূর্তি দেখার জন্য অবশ্য কোনো টিকিট লাগল না, শুধু পিরামিডের টিকিটের অংশটি দেখাতে হয়েছে।

পিরামিডের কাছে অনেক পেশাদার ফটোগ্রাফারের দেখা মিলল। এরা বিভিন্নভাবে ছবি তুলে দেয়। খরচ পড়ে ছবিপ্রতি ২০ থেকে ৩০ মিসরীয় পাউন্ড। আবার উটে চড়েও ছবি তোলা যাবে, তাতে খরচ অনেক, ১০০ মিসরীয় পাউন্ড।

দুপুর ২টা পর্যন্ত ঘোড়ার গাড়ি দিয়ে পুরো পিরামিড এলাকাটি ঘুরে দেখলাম। তারপর গাইড ইব্রাহিমকে কিছু বখশিশ দিয়ে বিদায় করে নিজেরাই ঘণ্টাখানেক ঘুরে বেড়ালাম।

বিকেল সাড়ে ৩টায় শেষ হলো আমাদের পিরামিড দর্শন। এর মধ্যে খিদেও লেগেছে বেশ। পিরামিডের প্রবেশ গেটের পাশে কেএফসিতে ঢুকে পড়লাম। এখানে ঢুকে যে ভুল করিনি, তা বুঝতে পারলাম তিনটি পিরামিড একসঙ্গে দেখতে পেরে।

Related Posts

Leave a Comment



cheap mlb jerseyscheap nfl jerseyscheap mlb jerseyscheap nhl jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseyscheap jerseys