সুমাইয়া আরিফিন এর একগুচ্ছ কবিতা 

by sylhetmedia.com

অভিমানী
…………………
এত বছর পরে
তুমি আবার ফিরে এলে,
আমার ভালোবাসার টানে নাকি
মায়ার টানে কোনটা?
সেই চেনা হাসি নিয়ে তুমি বললে,
নাগো না!তোমার না
কদম ফুলের টানে।
তুমি জানতে,
আমি কদম কতটা ভালবাসি
আর তাইত প্রতিবার কদম নিয়ে
আমার অভিমান ভাঙাতে তুমি আসতে।
কিন্তু এখন,
কত্ত অভিমান জমা হয়ে আছে
চলে যাচ্ছিলাম,ঠিক তখনি
চেনা সেই স্পর্শে ফিরে তাকালাম
দেখলাম এক গুচ্ছ কদম।
নিবেনা তুমি,এত্ত অভিমান করে আছো?
জানিনে,তবে এখন যে এই কদম নেওয়ার
জন্য আমি আর তোমার নেই।


কুহকিনী
…………………
অন্ধকার ঘরে ভালবাসা রোজ কেঁদে উঠে-নতমস্তকে
বিকট শব্দ-হেরে যাওয়া ভালবাসার,
কুহকিনী, আজো কেঁদে ফিরে স্মৃতির ভিড়ে।
আজ থেকে ঠিক বিশটি বছর আগে, ভালবাসার কমতি ছিলো না কুহুকিনীর কাছে;
দুরন্ত উদ্দীপনায় ছুটে বেড়াত গাঁয়ের পথে সকাল-সন্ধ্যা
দাদীমা বলতো, মেয়েলোকের ওভাবে হাঁটতে নেইরে কুহকিনী; সমাজ বড্ড খারাপ!
সমাজ কি! সমাজ কিভাবে খারাপ হয়!
হেয়ালি হাসিতে উড়িয়ে দাদীমার কথা বলতো কুহুকিনী।
সরলা কুহকিনী, জানতো না মানুষ কতটা খারাপ হয়!

বুঝেছিলো সেই সন্ধ্যায়, যেই সন্ধ্যা ছিলো বীভৎস সন্ধ্যা
দুরন্তপনায় চেনা পথে কুহুকিনী-হঠাৎ চোখে কালো কাপড়;
বুকের উপর নেকড়ের দল-স্তনযুগল ক্ষত-বিক্ষত
নাভীমূল থেকে নিম্নাংশে কি অসহ্য যন্ত্রণা
ব্যথা জড়ানো ক্লান্ত কণ্ঠ! যেতে দাও, আর পারি না!
রক্ত জড়ানো একটি ঝাপসা চোখ-দেখেছিলো নেকড়েগুলোকে
দেখেছিলো পৈশাচিক হাসি-শকুন দলের।
সকাল হতেই বস্ত্রহীন দেহ ঘিরে মনুষ্য সমাজ
কি হতবাক হওয়া সেই দৃশ্য; একটুকরো কাপড় নিয়ে কেউ এগিয়ে আসেনি-ক্যামেরার ব্যস্ততায়।

দীর্ঘকাল পর,
শকুনদের দলনেতার মুখে নারীর ইজ্জত রক্ষার ভাষণ
এটাই বাস্তবতা! এটাই সমাজ!
দাদীমা নেই, কথা রয়ে গেলো-পুরোনো কথা
বিশ বছর পর, কুহকিনী জানে সমাজ কি!
সমাজ কেনো খারাপ!
মূলত, সমাজের মানুষগুলো বড্ড খারাপ।


নদীজলে অতীত
…………………
এক দুপুরে আমাদের দেখা হয়েছিল
নদীর কিনারায় খাঁ খাঁ রোদে পুড়ে যাচ্ছিল শ্রমিক
প্রেমিকগন প্রেম নিবেদন করছিল।
দুপুরে নদীজল সর্বগ্রাসী খেলায় মত্ত হয়েছিল
ক্রমশ কালো হয়ে আসা অন্ধকার আকাশ
শব্দের বাঁধ ভাঙ্গা ঢেউখেলানো জল
হুইসেল বাজিয়ে ছুটে চলা ব্রিজের উপর ব্যস্ত ট্রেন
ঠিক সেই দুপুরে, সেই দুপুরেই
গুচ্ছ রজনীগন্ধা হাতের তালুতে রেখে শ্বাসপ্রশ্বাস বাড়িয়ে তুমি উচ্চারণ করেছিল সেই শব্দ- ভালোবাসি।
স্পৃহনীয় ছিল কিনা জানিনা
তবে অনুভূতিরা কৈশোরসুলভ বেপরোয়া হয়েছিল;
স্রোতের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশগ্রহণ করেছিল হৃদয়ের শব্দ
বন্ধ চোখে আমরা ভেসে গিয়েছিলাম জলের মতো;
চুমু- আমি- আমাদের মুহূর্ত।
কিন্তু, সময়ের উপর কারো রাজত্ব চলেনা
প্রকৃতি নিজস্বতায় কারো হস্তক্ষেপ মেনে নেয়না।
বছরখানিক হয়ে গেল
হাতে গুনে গুনে অতীত হয়ে গেল
আমাদের প্রেমের প্রথম স্পর্শ
এখন সঞ্চয় শুধুই,
অতীত- প্রাকৃতিক নদী- দিনপঞ্জিকায় লাল কলমের সেই তারিখ
কিংবা আমরা।


চন্দ্রাহত প্রণয়ী
………………..
সৃজনকর্তার সাথে বাজি ধরেছি-তোমায় নিয়ে
এক অনুপল না হারানোর বাজি।
আমার কুলের প্রতিটা নক্ত আলোকিত হবে
জ্যোৎস্না আলোকিত তোমার ধৃষ্টতা দেখে।
তোমার কনীনিকার গহীনে সুপ্তি যেতে চাই-অনন্তকাল
তোমার কান্ধে অনুবন্ধীত হওয়া-সব অলীক কল্পনা।
ভুলে গিয়েছি অদৃষ্ট বলেও কিছু আছে
নিজের পাণিতে যে কিছুই থাকেনা।
তাইতো লাল শাড়ির সাজানো স্বপ্ন
সাদা কাপড়ে অবস্থান্তরিত হলো-মৃত্যুর ছলে
সাজানো পালকি মৃতের আলয় চলে গেলো।
আর আমি,
থেকে গেলাম অদৃষ্টের ছলে হেরে যাওয়া-চন্দ্রাহত এক প্রণয়ী হয়ে!


প্রশ্নবোধক অভিমান
…………………
আমাদের দেখা হয়না বহুকাল
ঠিক কতকাল হবে তার হিসেব আমরা দিনপঞ্জিকায় করে রাখিনি
অমন বেখেয়ালিতে আমরা কত হিসেব ছেড়ে দিলাম;
পাশ ঘেঁষে আনমনে আঙ্গুল ছুঁয়ে মুহূর্ত সাক্ষী করার মতো কোনো খামখেয়ালিপনা-ই করা হয়নি;
মূলত ওটাই ছিল মহাকালীন সবচেয়ে বড় খামখেয়ালীপনা।
কবিতার পরিচয় খুঁজতে খুঁজতেই আমরা বুঝলাম-
নির্ঘুম কবিদের প্ররোচনাদায়ক ব্যথানিবারণ ভেষজদ্রব্য হলো কবিতা
আমরা কবিতার গভীরতা মাপতে গেলাম;
ব্ল্যাকহোল- এর গভীরতা হার মানে শব্দের কাছে।
কবিতার লাইনে ডুবেই আমরা নিয়মমতো হয়ে গেলাম মেডিক্যাল রিপোর্ট অনুযায়ী ইনসোমনিয়ার রুগী
ভেবে গন্তব্য পেলাম না!
রাতের বিষণ্ণতার পিছনকার দায়ভার কার,
কবিতার- কবির নাকি কবিতার পিছনকার ইতিহাসের?
যদিও এই প্রশ্ন কখনওই কোনো কবিকে করা হয়নি।
কত প্রশ্নবোধক কথা জমা হয়ে যায়
জীবন ডায়েরিতে মলিন হয়ে যায় সস্তা কলমে লিখা যত্নের স্মৃতিমূলক কাহিনী;
নতুন করে ডায়েরি লিখা হয়না।
বাস্তবতা আর নির্মমতার মধ্যকার সম্পর্ক খুব গভীর
এটুকু বুঝে কোনো কিছুই আর নতুন করে নতুনত্ব মেখে ফুটিয়ে তোলা হয়নি;
বলা যায় এটাই জীবনের পরিপক্কতা।
অপরিপক্বতার বয়সে যখন বর্ষাকালীন সময়ে শাপলা তুলতে গিয়েছি
পানির নিচ থেকে শাপলা টানতে গিয়ে বাবা বলেছিল,
জীবনের দৈর্ঘ্য শাপলার চেয়ে অধিক।
বাবার কথার চেয়ে অধিকতর মনযোগী ছিলাম ফুলের দিকে কিংবা অন্য কিছু
এইতো মনে পরেছে, সেই তখন আমি তোমায় ঝাপসা দেখেছিলাম
নদীর পাড়- নৌকো; কিংবা
কিংবা- মনে পড়ছেনা
মাথার ভিতর পুরোনো গন্ধ কটকট করছে
বয়সের সাথে সাথে ভুলে যাওয়ার বাতিক চাপে।
বর্ষাকালীন কদমে ভালোবাসার রঙ ফিকে হয়
শাপলা হাতে উষ্কখুষ্ক চুলের অমনোযোগী যে ছেলেটি এই কথা বলছিল
সামাজিক লোকমুখে বলা হয়- তিন বছর অতীত হয়েছে প্রেমিকার নদীডুব;
কেউ বলে ইচ্ছাকৃত ডুব কেউ বলে বর্ষাকালীন ঋতু
হুটহাট ছেলেটি বলে মেয়েটি অভিমানী।
শতাব্দীকাল পর সেই নদীর পাড়ে দাঁড়িয়েই দেখছি
লালটুকটুক ফ্রক, লাল ফিতে সাহায্যে দু’বেণী
ছোট মেয়েটি শাপলা তুলছে;
স্মৃতি ঝাপটাতে সময় অপেক্ষা করেনা।
বাবার কবর নদীর পাড়ে- বাবার ইচ্ছের ঘুম
খুব গভীরতা দিয়ে ভাবতে গিয়েই মনে হয়,
মা ওখানে শুয়ে আছে।
প্রভু তাদের পাশাপাশি ক’বছর রেখেছে আমি জানিনা
আমি জানিনা, আমাদের আবার কখন দেখা হবে!
প্রভু জানেন-
তিনি সব লিখে রাখেন তার নিজস্ব ডায়েরিতে
আমাদের স্মৃতি ঝাপসা করে তিনি অন্য কারো।

Related Posts