স্কুলছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা, গ্রেপ্তার ৫

by sylhetmedia.com

নিউজ ডেস্ক: বিদেশে লোক পাঠানোর ঝামেলাকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের লোকজনের উপর্যুপরি লাথি, কিল, ঘুষিতে প্রাণ গেল সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরের বাবুল মিয়ার ৮ম শ্রেণি পড়ুয়া কিশোর ছেলে কামরুল ইসলামের (১৫)।

ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল মঙ্গলবার (৩ ডিসেম্বর) রাতে তার মরদেহ গ্রামের বাড়ি জগন্নাথপুর উপজেলার রানীগঞ্জ ইউনিয়নের দোস্তপুরে এসে পৌঁছালে সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণ হয়। রাত ৮টায় জানাজা শেষে তার দাফন সম্পন্ন হয়।

আজ বুধবার (৪ ডিসেম্বর) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নিহত কিশোরের বাড়িতে পিনপতন নিরবতা। তার মা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। কারো সঙ্গে কথা বলছেন না। শুধু চোখ থেকে জল পড়ছে।

নিহত স্কুলছাত্রের বাবা বাবুল মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘অভাব অনটনের সংসারে স্বচ্ছতা আনতে ১২ বছর আগে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে গ্রামের বাড়ি থেকে বের হয়ে সিলেটের দক্ষিণ সুরমা থানার নাজিরবাজারে ভাড়ায় বাসা নিয়ে বাসবাস করে আসছিলাম। ট্রলি চালিয়ে সংসারের খরচ আর সন্তানের লেখাপড়া চালিয়ে আসছি। কিন্তু একটি বিরোধের কারণে আমার নিরপরাধ একমাত্র ছেলেকে হারাতে হবে- এটা কখনও ভাবতে পারিনি। এখন বার বার মনে হচ্ছে, কেন গ্রামের বাড়ি ছেড়ে গেলাম। যদি নিজের বাড়িতে থাকতাম, তাহলে হয়তো ঘাতকের হাতে আমার ছেলে খুন হতো না।’ এ সময় ছেলের হত্যাকারীদের ফাঁসি দাবি করেছেন তিনি।

এলাকাবাসী ও মামলা সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন আগে থেকে বাবুল মিয়া তার স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে সিলেটের দক্ষিণ সুরমা থানার নাজিরবাজার এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করে আসছিলেন। পেশায় তিনি একজন ট্রলি চালক। নাজিরবাজারের পাশ্ববর্তী বিশ্বনাথ থানার বর্মদা গ্রামের ফজর আলীর সঙ্গে পূর্বপরিচয় ছিল বাবুল মিয়ার। সে সুবাদে বাবুল মিয়াকে ফজর আলী জানান, তার ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে যান। তখন কথা প্রসঙ্গে ট্রলি চালক বাবুল মিয়া ফজর আলীকে বলেন, তার ছোট ভায়রার নাম সালাউদ্দিন, তিনি কাতারে থাকেন। আপনি চাইলে সালাউদ্দিন ও আমার শ্যালিকার সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ করতে পারেন। পরে ফজর আলী বাবুলের ভায়রার সঙ্গে যোগাযোগ করে তার ছোট ছেলে আল আমিনকে ৪ থেকে ৫ মাস পূর্বে বৈধভাবে কাতারে পাঠান। কাতারে ভিসা এবং কাজ নিয়ে সালাউদ্দিনের সঙ্গে আল আমিনের মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়।

বিষয়টি সমাধানে ট্রলি চালক বাবুল মিয়া চেষ্টা চালালেও ফজর আলী এবং তাদের লোকজন হুমকি দিতে থাকেন ট্রলি চালককে। প্রায় ৮ থেকে ১০ দিন আগে রাতে ফজর আলীর লোকজন ট্রলি চালকের বাসায় গিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে খালি ষ্ট্যাম্প পেপারে বাবুল মিয়ার সাক্ষর নেয়। এই দৃশ্য বাবুলের ছেলে নাজির বাজার জাগরণ উচ্চবিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণির ছাত্র কামরুল মুঠোফোনে ভিডিও করে। বিষয়টি টের পেয়ে যায় ফজর আলীর লোকজন।

গত রোববার (১ ডিসেম্বর) ফজর আলীসহ কয়েকজন ব্যক্তি বাবুলের ওপর হামলা চালায়। এতে বাধা দেন বাবুলের স্ত্রী-সন্তানরা। এ সময় বাবুলের কিশোর ছেলে কামরুল ইসলামকে বেধড়ক লাথি, কিল, ঘুষি মেরে গুরুতর আহত করে বাবুল মিয়াকে ফজল আলীর লোকজন জোর করে ধরে নিয়ে গিয়ে তাদের বাড়িতে আটকে রাখে। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করেন।

এদিকে, আহত স্কুলছাত্র কামরুলকে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে মঙ্গলবার (৩ ডিসেম্বর) ভোরে চিকিসাধীন অবস্থায় সে মারা যায়।

এ ঘটনায় মঙ্গলবার বিকেলে নিহত স্কুলছাত্রের বাবা বাদী হয়ে সিলেটের দক্ষিণ সুরমা থানায় ফজর আলীকে প্রধান আসামি করে ৪ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশ মামলার চার আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- ধর্মদা গ্রামের ফজর আলী (৫৫), তার ছেলে আব্দুস সামাদ আশরাফ (২৫), সুয়েব মিয়া (২১) ও লায়েক মিয়া (১৯)।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দক্ষিণ সুরমা থানার এসআই লোকমান জানান, হত্যা মামলার চার আসামিকে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।

Related Posts